ডিসিসিআইয়ের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

শিল্প খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারে পাঁচ বছরে চাকরি হারাতে পারে ৫৩ লাখের বেশি মানুষ

শিল্প খাতে বর্তমানে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা প্রক্রিয়া বহির্গমন, মাল্টিমিডিয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আইওটি ও রোবটিকসের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে ৫৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ চাকরি হারাতে পারে।

শিল্প খাতে বর্তমানে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা প্রক্রিয়া বহির্গমন, মাল্টিমিডিয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আইওটি ও রোবটিকসের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে ৫৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ চাকরি হারাতে পারে। এ খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, খাদ্য ও কৃষি, ফার্নিচার, পর্যটন ও হসপিটালিটি। এছাড়া দেশে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাদারের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অব ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে গতকাল এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে। ঢাকা চেম্বারের আয়োজনে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে স্মার্ট মানবসম্পদ উন্নয়ন’ শীর্ষক এ বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ভিজিটিং অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ।

বৈঠকে তিনি জানান, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্যানুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বর্তমান চাকরির বাজার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বদলে যাবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে একই সময়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ তাদের বর্তমান চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘এমন প্রেক্ষাপটে একটি ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাকরির বাজারে সফল হতে হলে নিরবচ্ছিন্নভাবে নতুন দক্ষতা অর্জন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এছাড়া বাংলাদেশে এমন ঘাটতি পূরণের জন্য ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনতে হবে।’

বৈঠকে স্বাগত বক্তব্যে তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ক্রমেই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে টিকে থাকতে স্মার্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্মার্ট মানবসম্পদই হবে বাংলাদেশের প্রধান ভরসা।’

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আরো বলেন, ‘দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে শুধু দক্ষতাই নয়, দরকার প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা ও সৃজনশীল চিন্তা। দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে অভিযোজন ক্ষমতাই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। দেশে প্রায় ১৭৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত। ফলে চাহিদাসম্পন্ন স্নাতকদের অনেকে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এতে দেশের শিল্প খাত দক্ষ জনবলের সংকটে ভুগছে।’

এ সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী জানান, প্রশিক্ষণ প্রদানে নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা রয়েছে। একই সঙ্গে মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে সর্বস্তরে সচেতনতার অভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে এনএসডিএ নিজের আইনি কাঠামো, ভৌত ও প্রশাসনিক অবকাঠামোর ওপর নজর দিলেও বর্তমানে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রশিক্ষণের ওপর বেশি মনোযোগী।’

ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাইসুল কবীর বলেন, ‘এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত ও মানসম্মত কাজের চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।’ তবে ভবিষ্যতের চাহিদার নিরিখে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ খাতে মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাসরুর আলী বলেন, ‘গ্রাম ও শহরের বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষার মানে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে এসব শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর থেকেই বৈষম্যের শিকার।’ এ অবস্থায় শিক্ষার সর্বস্তরে মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের মাত্র ২০ শতাংশ তাদের দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি পেয়ে থাকে। প্রায় ২ মিলিয়ন শিক্ষার্থী বেকার রয়েছেন।’ এ অবস্থা মোকাবেলায় কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকে আরো অংশ নেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের যুগ্ম সচিব (আইসিটি বিভাগ) মোহাম্মদ সাইফুল হাসান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস রহমান, ট্রান্সকম গ্রুপের করপোরেট মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান এম সাব্বির আলী ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর রিজিওনাল সিনিয়র ম্যানেজার খান মোহাম্মদ শফিকুল আলম।

আরও